বিশ্ববিদ্যালয় মানেই ক্লাসরুমের চার দেয়ালের গণ্ডি নয়, এখানে তৈরি হয় প্রতিবাদের ভাষা, স্বপ্ন দেখায় নতুন দিগন্তের, সোচ্চার করে তোলে বঞ্চনার বিরুদ্ধে । শিক্ষার্থীরা এখানে শুধু পাঠ্যপুস্তক মুখস্থ করে না, বরং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে তোলে নিজের চিন্তার স্বাধীনতা। আর এই স্বাধীনতাকে লিপিবদ্ধ করার, সময়ের সাক্ষী হয়ে ওঠার দায়িত্ব নেয় একদল তরুণ-তরুণী—যারা পরিচিত ক্যাম্পাস সাংবাদিক নামে।
তারা শব্দের কারিগর, কলমকে সঙ্গী বানিয়ে অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়ায়। কিন্তু এই পথ কি এতটাই সহজ? কতটা চ্যালেঞ্জ, কতটা দায়িত্ব আর কতটা আত্মত্যাগ জড়িয়ে আছে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার সঙ্গে?
তাই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে তানিম মল্লিক খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছেন ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার আনন্দ, সংগ্রাম, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার গল্প।
ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা:দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ
একরামুল হক
ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিন
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ ও প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করা ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কখনো বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে, কখনো সমালোচনার শিকারও হতে হয়েছে। তবে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে অনেক সমস্যার সমাধানের পথও খুঁজে পাওয়া গেছে। এ কাজে চ্যালেঞ্জ অনেক। ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় যারা নতুন আসবে, তাদের ক্যাম্পাসের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতে হবে, সোর্স তৈরি করতে হবে এবং সমসাময়িক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের ওপর গভীর জ্ঞান রাখতে হবে। সত্য প্রকাশে হতে হবে সাহসী। তবে ভুল তথ্য যেন প্রচারিত না হয়, সে বিষয়েও বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে।
ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা
অর্ক মন্ডল
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিন
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
সাধারণ কোনো বিষয় নিয়ে রিপোর্ট করতে গেলে সাংবাদিক পরিচয় দিলে প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের ভিতর কিসের যেন জড়তা বা ভয় দেখা যায়।আমাদের কেউ কখনো এটা বলে না যে নিউজ করা যাবে না। কিন্তু সমস্যা পর্যাপ্ত তথ্য না দেওয়ায়।যেমন কিছু দিন আগে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দির নিয়ে একটা রিপোর্ট করতে যায়। কিন্তু শিক্ষার্থী ও কমিটির কাছ থেকে পূর্ববর্তী বছরগুলোর তথ্য না পাওয়ার কারণে রিপোর্টটি অবশেষে করা হয়ে উঠে নি।ঠিক একই অবস্থা প্রশাসনের।কোনো স্থাপনার বাজেট শুনলেই প্রশাসনের কোনো বিভাগের কাছে আর কোনো তথ্য থাকে না।থাকলেও তা জনসংযোগ বিভাগ, প্লানিং ডিপার্টমেন্ট ,ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট, অর্থ ও হিসাব বিভাগ, রেজিস্টার অফিস এগুলোর ভিতর ঘুরতে থাকে । যেগুলো নাগাল পাওয়া সাংবাদিকদের জন্য একটু কষ্টসাধ্য, কিছু ক্ষেত্রে অসাধ্য। এসব ক্ষেত্রে ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। প্রশাসন সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ না ভেবে, যদি অংশ মনে করে তাহলে পরিবর্তন সম্ভব।
আগ্রহের পূর্ণতা দিয়েছে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা
রুশাইদ আহমেদ
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়
মূলত গান-কবিতা লেখা শুরুর মধ্য দিয়ে আমার লেখালেখির প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়। এ ছাড়া, আমার আব্বাও দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে সবমিলিয়ে লেখালেখি অব্যাহত রাখতে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় সাংবাদিকতা বিভাগকে প্রাধান্য দিই। পরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হওয়ার দুমাসের মাথায় ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় যুক্ত হই। পাশাপাশি কলাম লেখা এবং বিদেশি নিবন্ধ অনুবাদের কাজও করছি আমি সীমিত পরিসরে।প্রথমদিকে আমি সাধারণত প্রেস রিলিজ এবং দিবসকেন্দ্রিক রিপোর্টিং করতাম। এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য সেক্টরে অনুসন্ধানী রিপোর্টিংয়েও বেশকিছু কাজ করেছি। সব মিলিয়ে আমার কাছে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতাকে খুবই চ্যালেঞ্জিং মনে হয়। সার্বিকভাবে বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতা এ ক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা বিকাশে পরিপূর্ণ সহায়তা করে।
ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার পথ কেমন?
মোঃ আসিব ইকবাল
লোক প্রশাসন বিভাগ
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
যখন আমি প্রথম সাংবাদিকতা শুরু করি, তখন মনে হতো এটি কেবল তথ্য সংগ্রহের কাজ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বুঝতে পেরেছি, এটি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর এক শক্তিশালী মাধ্যম।তবে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার পথ সহজ নয়। সত্য বলার কারণে কখনো চাপ, কখনো প্রতিকূলতা এসেছে, কখনো কাছের মানুষের ভিন্ন দষ্টিভঙ্গির মুখে পড়তে হয়েছে। কিন্তু দিনের শেষে জানি, আমার দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষ থেকে সঠিক তথ্য তুলে ধরা।অনেক সময় দ্রুত সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছি, কিন্তু যখন দেখি, একটি সংবাদ প্রশাসনকে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে বা শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে, তখন মনে হয়-এই পরিশ্রম সার্থক।
ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার সম্ভাবনা কতটুকু
আবু ছালেহ শোয়েব
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা যেমন চ্যালেঞ্জিং, তেমনি সম্ভাবনাময়। একবার সংঘর্ষের ভিডিও ধারণের সময় শারীরিক হামলার শিকার হয়েছি। অতীতে রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশে মামলা ও হুমকি পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যদিও এখন পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।সাংবাদিকরা যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, র্যাংকিং উন্নতি, শিক্ষার্থীদের সাফল্য ও সুযোগ-সুবিধার দিক তুলে ধরেন, তাহলে তা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বৃদ্ধি করে। তবে শুধুমাত্র অনিয়ম ও সমস্যা নিয়ে কাজ করলে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে। তাই ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।
আরইউএস