নতুন বছরের আগমনকে ঘিরে আমাদের উৎসাহ-উদ্দীপনার শেষ নেই, থাকেও না। তা বাংলা নববর্ষের পয়লা বৈশাখ হোক বা ইংরেজি ক্যালেন্ডারের হ্যাপি নিউ ইয়ার হোক। ইংরেজি নতুন বর্ষের প্রথম দিনে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে, আনন্দ-বেদনা, সাফল্য-ব্যর্থতা, প্রাপ্তি-বঞ্চনার হিসাব-নিকাশকে পেছনে ফেলে মানুষ মেতে উঠে বাঁধভাঙা উল্লাসে। প্রতি বছরই থার্টি ফার্স্ট নাইটে রাজধানী ঢাকার আকাশে দেখা মিলে হাজার হাজার জ্বলন্ত ফানুস। চারদিক কাঁপিয়ে ফুটে বাজি, আতশবাজির আলোয় ঝলমল হবে সর্বত্র। বাজির শব্দ আর আলো সবাইকে জানান দেয় নতুন ইংরেজি বছর এসে গেছে।
নতুন বছরের বরণ অনুষ্ঠানে বাঁধভাঙা উল্লাস যেমন আছে তেমনি কিছু কিছু ঘটনা যা প্রতিবছরই মানুষের সারাজীবনের কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জ্বলন্ত ফানুস ও আতশবাজি ফোটানোর কারণে শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাতেই বিভিন্ন যায়গায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সাথে বহু হতাহতের ঘটনাও ঘটে।
আবার থার্টি ফার্স্ট নাইটকে কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগরীতে নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে প্রতিবারই বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা দেয় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তার পরও অসচেতনতা ও অসাবধানতার কারনে প্রতিবারই দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা ঘটেই চলেছে।
গতকাল রোববার (৩১ ডিসেম্বর) রাতে ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’ উদযাপন উপলক্ষে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে মজিবর ঘাট এলাকার একটি বাসার ছাদে কেরোসিন মুখে নিয়ে আগুন জ্বালানোর সময় তিন কিশোর দগ্ধ হয়েছে। বর্তমানে তারা শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। গতকাল রাতে পুরান ঢাকায় আরও একটি আগুনের ঘটনা ঘটে। সাড়ে ১২টার দিকে পুরান ঢাকার নাজিরা বাজারে বিউটি লাচ্ছির পার্শ্ববর্তী একটি ক্যামিকেল গোডাউনে এ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এছাড়া ঢাকার অদুরে গাজীপুরের কালীগঞ্জে থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপনে সাউন্ড বক্সে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মৃত্যু হয় এক কিশোরের।
২০২২ সালকে বরণ করে নিতে গিয়ে ঘটেছিলো আরো বড় দুর্ঘটনা। আতশবাজি ও ফানুশের কারণে আগুনে পুড়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গুদাম, নিঃস্ব হয়েছে বহু মানুষ। সেইবার ইউসুফ রায়হান নামের এক বাবার ফেসবুক পোস্টের কথা নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে। তিনি লিখেছিলেন, ‘কী ভীষণ শব্দে আতশবাজি! আমার ছোট্ট বাচ্চাটি এমনিতেই হার্টের রোগী। আতশবাজির প্রচণ্ড শব্দে শিশু বাচ্চাটি আমার ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে ওঠে। খুব ভয় পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। খুবই আতঙ্কের মধ্যে সময়টা পার করছি।’
পরে তার আরেক পোস্টের মাধ্যমে জানতে পেরেছিলাম শিশুটিকে ঢাকার হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে নিতে হয় এবং নতুন বছরের প্রথম দিনই মারা যায় সে। অন্যদের আনন্দ উদ্যাপন নতুন বছরের শুরুতেই একটি পরিবারে শোক ডেকে এনেছিলো।
থার্টি ফার্স্ট নাইটকে সামনে রেখে আতশবাজি ফোটানো ও ফানুস না ওড়ানোর আহ্বান জানিয়ে গত রোববার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আতশবাজি ফোটানো ও ফানুস ওড়ানোর কারণে বিগত পাঁচ বছরে দেশে ২৮০টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য মতে, ২০২২ সালের থার্টি ফার্স্ট নাইটে আতশবাজি ফোটানো ও ফানুস ওড়ানোর কারণে প্রায় ১০০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যাতে আনুমানিক ১৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকার ক্ষতি হয়। আতশবাজি ফোটানো ও ফানুস ওড়ানো থেকে ২০২১ সালে ১৬টি অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৪ লাখ ৫ হাজার টাকার ক্ষতি হয় এবং আতশবাজির উচ্চশব্দে তানজিম উমায়ের ওরফে মাহমুদুল হাসান নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। ‘২০২০ সালে ৫০টি অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, ২০১৯ সালে ৭২টি অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১৪ লাখ ৪৭ হাজার টাকা এবং ২০১৮ সালে ৪২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রায় ৫৬ লাখ ৬ হাজার টাকার ক্ষতি সাধিত হয়।
এই থার্টি ফার্স্ট নাইটকে কেন্দ্র করে কোনও ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে সে জন্য ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ছয়টা থেকে পরদিন (১ জানুয়ারি) সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার জন্য দেশের সব মদের বার বন্ধ ও একইসঙ্গে পাঁচ তারকা বা অভিজাত হোটেল কিংবা ক্লাব খোলা থাকলেও সেখানকার মদের বারগুলো বন্ধ থাকবে বলে জানান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কাগজে কলমে এইসব নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবতা পুরপুরি উল্টো। অনুসন্ধানে দেখা যায় গতকাল পাঁচ তারকা বা অভিজাত হোটেল গুলোতে দেদারসে বিক্রি হয়েছে মদ ও বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। যা গ্রহন করে নাচ-গান, হই-হুল্লোড় ও নানা আয়োজনে এই রাতটি পার করে অভিজাত এলাকার যুবক যুবতীরা।
শহরের অভিজাত পাঁচ তারকা বা অভিজাত হোটেল ও ক্লাবগুলোতে গান, বাজনা, ডিজে নৃত্য, যুবক-যুবতীদের বাধাহীন উল্লাস, মাদকদ্রব্য সেবনসহ এমন সব কর্মকাণ্ডের আয়োজন করা হয়, যা তাদের বিভিন্ন অপকর্ম করতে প্রলুব্ধ করে।
আতশবাজি ফোটানো ও ফানুস ওড়ানোতে মানুষের পাশাপাশি ক্ষতি হয় পশুপাখিরও। আতশবাজি বা পটকাবাজির শব্দে প্রাণীরা চমকে উঠে। এর কারণে প্রতিবছর হাজারো পাখি ও বন্যপ্রাণী অসুস্থ হয়ে মৃত্যু বরণ করে। পথে থাকা কুকুর-বিড়াল ভয়ে ছোটাছুটি করে, আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তাছাড়া এ থেকে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে মারাত্মক বায়ু দূষণ ঘটায়, যা ফুসফুসের নানা রোগের কারণ।
এখন প্রশ্ন, হাজার হাজার মানুষ যদি আতশবাজি ফোটায় আর ফানুশ ওড়ায়, তাদের বিরুদ্ধে কীভাবে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। এরপরেও আমরা বিশ্বাস করি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাইলে সেটি পারে। তবে নাগরিকেরা নিজেরা সচেতন না হলে কোনোভাবেই উৎসবের নামে এই ‘অরাজকতা’ বন্ধ করা সম্ভব হবে না। দিন শেষে আমরা কেউ চাই না, আনন্দ উদ্যাপন করতে গিয়ে একটি শিশুর বা একটি পাখিরও ক্ষতি না হোক।