পাকিস্তানের ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এফআইএ) মুলতান বিমানবন্দরে সৌদি আরবগামী একটি ফ্লাইট থেকে ১৬ জন ভিক্ষুককে নামিয়ে দেয়। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা ভিসা প্রক্রিয়ার জন্য এজেন্টদের ১ লাখ ৮৫ হাজার রুপি (প্রায় ৬৬০ ডলার) প্রদান করেছেন।
পাকিস্তানের প্রায় প্রতিটি শহর, গ্রাম, কিংবা বাজারে ভিক্ষুকদের দেখা যায়। যদিও কিছু অসুস্থ এবং বৃদ্ধ মানুষ ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত, অধিকাংশ ভিক্ষুক হলো শিশু, যারা সামান্য কিছু বিক্রির বাহানায় যানজটে আটকা পড়া গাড়ির সারিতে ঘুরে বেড়ায়।
পাকিস্তানে ভিক্ষাবৃত্তি আইনত নিষিদ্ধ। ১৯৫৮ সালের ভেগ্রেন্সি অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, ভিক্ষাবৃত্তি বেআইনি এবং এর জন্য তিন বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। তবে এই আইন কার্যকর না হওয়ায়, ভিক্ষাবৃত্তি ব্যাপক হারে বিস্তৃত হয়েছে।
ডন পত্রিকার ২০২৩ সালের একটি সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে, “পাকিস্তানে লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিক্ষাবৃত্তিকে তাদের আয়ের উৎস হিসেবে বেছে নিয়েছে। তারা এমন এক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যা আন্তর্জাতিক সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত।”
শহরের কেন্দ্রস্থলে ভিক্ষাবৃত্তি লাভজনক হওয়ায়, সেখানে ব্যক্তিগতভাবে ভিক্ষা করা সম্ভব হয় না। কারণ, এসব এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণ করে এক ধরনের মাফিয়া চক্র। এ চক্র ভিক্ষুকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে লাভবান হয়।
আমার ব্যক্তিগত তদন্তে জানা গেছে, ভিক্ষুকদের জন্য আলাদা আইনজীবীও রয়েছেন, যারা তাদের গ্রেপ্তার হলে পুলিশের হাত থেকে মুক্তি পেতে সহায়তা করেন। এছাড়া, অনেক ভিক্ষুক দৈনিক মজুরিতে ভিক্ষা করেন এবং দিনের শেষে আয়ের একটি অংশ তাদের মাফিয়া বসদের দিয়ে দেন।
পাকিস্তানে ভিক্ষাবৃত্তি এখন একটি পেশা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। কিছু গোষ্ঠী এবং উপজাতি এটিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করেছে।
এই ভিক্ষাবৃত্তি এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পৌঁছে গেছে। পাকিস্তানি ভিক্ষুকরা ইরান থেকে সৌদি আরব পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। সৌদি আরবের হজ ভিসা ব্যবস্থার সহজ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সেখানে যাওয়া সবচেয়ে সাধারণ পদ্ধতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, হজ ভিসার জন্য জটিল কাগজপত্রের প্রয়োজন হয় না।
কিছু দেশের কূটনীতিকরা জানান, তাদের কারাগারগুলো পাকিস্তানি ভিক্ষুক দিয়ে ভরে গেছে এবং তারা পাকিস্তান সরকারকে এই বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে চাপ দিচ্ছে।
এফআইএ সম্প্রতি মুলতান বিমানবন্দরে ভিক্ষুকদের আটক করেছে। সৌদি আরবে প্রবেশের জন্য তারা এজেন্টদের বিশাল অংকের অর্থ প্রদান করেছে এবং কিছু ভিক্ষুক তাদের আয়ের একটি অংশ এজেন্টদের দেয়ার শর্তে বিদেশ যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে।
সৌদি সরকার ইতোমধ্যেই পাকিস্তানকে সতর্ক করেছে, কারণ পাকিস্তানি ভিক্ষুকরা হজের আড়ালে সৌদি আরবে প্রবেশ করছে। এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে, ওমরাহ ও হজযাত্রীদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে তারা।
পাকিস্তানের ধর্ম মন্ত্রণালয় “ওমরাহ আইন” চালু করার পরিকল্পনা করছে, যার মাধ্যমে ভ্রমণ সংস্থাগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে। সেইসঙ্গে, পাকিস্তানি ভিক্ষুকদের হজের আড়ালে বিদেশে যাওয়া বন্ধেরও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির সমাধান মূলত পাকিস্তান সরকারের ওপর নির্ভর করে। দেশে ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করার ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে, এই লাভজনক ব্যবসা বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম। দেশের দারিদ্র্য এবং সুযোগের অভাবে মানুষ ভিক্ষাবৃত্তির মতো পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
ভিক্ষাবৃত্তি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ায়, এটি নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপও বাড়ছে। ফলে, ভিক্ষাবৃত্তিকে একটি বড় সামাজিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে, বিশেষ করে যখন এটি প্রধানত নিপীড়িত শিশুদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।